কলকাতা কালিনারি গিল্ড সম্পাদকীয়।
শেফ দেড় রান্না কেবলমাত্র খাদ্য শিল্প মাধ্যম হিসেবে দেখলে ভুল হবে, সুস্থ ভবিষৎ জাতি গঠনের মূল ভিত্তি তৈরী করাও তাদের দায়বর্তায়। আমাদের নতুন প্রজন্ম কিভাবে শারীরিক সক্ষম ও মানসিকভাবে প্রখর হয়ে উঠবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে শৈশবের পুষ্টির ওপর। গত কয়েক দশকে শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ভারত এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার ৭৮ শতাংশ কমেছে, যা নিঃসন্দেহে এক আশাব্যঞ্জক বা মাইলফলক অর্জন বলতে পারেন। তবে মুদ্রার অপর পিঠে এখনো রয়ে গেছে অপুষ্টি (স্টান্টিং ও ওয়েস্টিং) এবং আমাদের বহুবিধ অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবার বৈষম্যের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ আজো বিদ্যমান।
অতি সম্প্রীতি 'ইন্ড অফ চাইল্ডহুড ইনডেক্স' (End of Childhood Index.) অনুযায়ী পৃথিবীর ১৭৬টি দেশের মধ্যে ভারতের ১১৩তম অবস্থান আমাদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানায়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গসহ উত্তর ভারতের কিছু রাজ্যে এখনো শিশুপুষ্টির ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ও আদিবাসী এলাকাগুলোতে এখনও স্টান্টিং (Stunting) এবং রক্তাল্পতার (Anemia) হার উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবারের চেয়ে স্বাদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টির অভাব থেকে যায়।
একজন শেফ এবং খাদ্যপ্রেমী হিসেবে আমরা কি এর দায়বদ্ধতা এড়াতে পারি? নিশ্চয়ই না। শেফ দের রান্নাঘর এবং তাদের যথার্থ খাদ্য সচেতনাই পারে শিশু দের জন্য স্বাস্থ্যের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে। কলকাতা কালিনারি গিল্ডকে এই বিষয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা নিতে হবে বলে আমরা মনে করি। আমাদের লক্ষ্য হলো মাছ, মাংস ও স্থানীয় শাকসবজির মাধ্যমে এমন এক সুষম খাদ্যতালিকা তৈরি করা, যা শুধু স্বাদের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং পুষ্টিগুণে ভারসাম্য বজায় রাখা বিশেষ লক্ষণীয়। শিশুদের জন্য আমরা যে খাদ্য সুপারিশ করছি তা হল যেমন: -
- প্রোটিনের যোগান: মাছ এবং মাংস শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। তবে রান্নার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল-মসলা বর্জন করে স্টু, গ্রিল বা স্টিমিং পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে।
- পুষ্টিকর টিফিন: প্যাকেটজাত জাঙ্ক ফুডের বদলে বাড়িতে তৈরি মাছের কাটলেট, চিকেন স্যান্ডউইচ বা সবজি দেওয়া পরোটা টিফিনে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা।
- সমাজ সচেতনতা: গাজর, বিনস, ব্রকলি বা স্থানীয় মরসুমি শাকসবজিকে মাছ-মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে রাঁধার সৃজনশীল কৌশলগুলো আমাদের শেফদের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেয়া। গ্রামীণ ও আদিবাসী এলাকাগুলোতে মিডডে মিল এর মতো বিষয় গুলিকে গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করা।
আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সুচিন্তিত রান্নার মাধ্যমে আমরা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে সাহাহ্যে করতে পারি। গিল্ডের প্রতিটি সদস্য শিশুদের জন্য পুষ্টিকর রেসিপি প্রণয়ন ও তা জনপ্রিয় করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS) বা ইউনিসেফের তথ্যের মতো নির্ভরযোগ্য উৎসগুলো আমাদের পথ চলতে সাহায্য করছে।
পরিশেষে, কলকাতা কালিনারি গিল্ডের পক্ষ থেকে আমাদের আহ্বান - আসুন, সঠিক রান্না এবং পরিবেশনের মাধ্যমেই আমরা আমাদের শিশুদের জন্য একটি সুন্দর, সুস্থ ও পুষ্টিকর ভবিষ্যৎ উপহার দিই। মনে রাখবেন, আজকের সুস্থ শিশু মানেই আগামীর এক বলিষ্ঠ ভারত।
বাংলার রান্নাঘর ও খাদ্য সংস্কৃতির নবজাগরণ।
বাংলা রান্নার ইতিহাস বহু পুরোনো হলেও, আধুনিক পরিকল্পিত ও মুদ্রিত ছাপা অক্ষরে রান্নার বইয়ের আবির্ভাব ঘটে মূলত ঔপনিবেশিক যুগে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ছাপাখানার বিস্তার, বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান এবং আধুনিক গৃহস্থালি সংস্কারের প্রবণতা, এই তিনটি উপাদান মিলিত হয়ে রান্নার বইকে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ক্ষেত্রে পরিণত করে।
কলকাতা হসপিটালিটি ব্যবসার ইতিহাস।
কলকাতায় হসপিটালিটি ব্যবসার ইতিহাস যে অনেক পুরোনো তাতে কোনো দ্বিমত নেই। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা যখন ব্রিটিশ রাজের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতাতে স্থানান্তর হয়, তখনই এই ব্যবসার গোড়াপত্তন শুরু হয়। ব্রিটিশরা তথা ইউরোপীয়রা যখন কলকাতায় আসা-যাওয়া শুরু করে, তখন তাদের থাকা-খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
বাঙালির খাদ্য অভ্যাসে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক কাল।
বাঙালির খাদ্য অভ্যাসে এ এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণ। বাঙালির হাজার বছরের খাদ্য ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলা চলে। কিন্তু বঙ্গীয় খাদ্যভ্যাসে পরিবর্ত যে খুব সহজেই হয়ে ছিল তা কিন্তু নয়। দশ ঘাটের জল খেয়ে বাঙালি আজ এ পর্যায়ে। কত না সংস্কৃতি এসে মিশেছে এই বাংলার পাড়ে। পারস্য, পর্তুগিজ, বিলিতি, চীনা, দিশি কত ঘাটের রান্নার স্রোত এসে মিলেছে বাঙালির পাতে।